কুশিয়ারায় লঞ্চ ভ্রমনের দিনগুলো

শীতের সকাল। কুয়াশায় সামনের কিছুই দেখা যাচ্ছিলনা। বাড়ী থেকে প্রায় মাইল খানেক পায়ে হেঁটে হাসপাতালের ঘাট থেকে ৮টার লঞ্চে উঠলাম শেরপুর যাব। খুব সম্ভবত ফরহাদ, কামাল বা এম ভি পারভিন নামের এই তিনটা থেকে যে কোন একটায় উঠেছিলাম। উপরে উঠে কেবিনে দেখলাম এক ভদ্রলোক কাশ্মীরি চাদর গায়ে দিয়ে মাথা মুড়িয়ে লাম্বা হয়ে শুয়ে আছেন। আমিও বিপরীত পাশের সিটে ঠাণ্ডা বাতাসের জন্য দরজা জানালা বন্ধ করে বসে রইলাম।  ততক্ষণে ইনাতগঞ্জের ঘাটে লঞ্চ ভিড়াইল। আরেক মুরব্বি টাইপের এক ভদ্রলোক এসে কেবিনে ঢুকলেন। তিনিও সিটের এক কোণায় চুপচাপ বসে আছেন। নীরবতা ভাঙানোর জন্য উনি আমার পরিচয় জানতে চেয়ে গপসপ করতে লাগলেন। আমাদের কথাবার্তা শুনে শুয়ে থাকা লোকটির ঘুম ভেঙ্গে গেল। ইশশিরে! ঘুমাইতে পারলামনা বলে উনি উঠে বসলেন। আমরাও যে আরামে বসেছিলাম তা না। আমার পাশে বসা ভদ্রলোক বলেই ফেললেন আপনার নাক ডাকার কারণে আমরাও আরামে বসতে পারিনি। 
বলা যায় যে উভয়ের মধ্যে কিছুটা মৃদু রাগের স্বরে কথা চলছিল। আমার কিছু বলার ছিলনা বাচ্চা মানুষ, শুধু বলতেছিলাম চাচা বাদদেন।

যাইহোক একসময় উভয়ের মাথা ঠাণ্ডা হল। একে অপরের পরিচয় জানতে চাইলেন। একজন বললেন, আমার বাড়ী রউআইল। আরেকজন ফলিকোনার কোন এক গ্রামের নাম বলেছিলেন ঠিক মনে করতে পারছিনা। উভয়ই পাশাপাশি গ্রামের নাম বলতেই তাদের মধ্যে জানার কৌতূহলটা যেন আরো বেড়ে গেল।  ততক্ষণে আরও দুই চারজন ভিতরে এসে বসলেন। আমি প্রথম থেকে শুনতেছি বিধায় বিষয়টা খুব কৌতুহলী হয়ে বিষয়টি উপভোগ করছি। প্রশ্ন আর উত্তর পর্ব চলতেই থাকল। বুঝতে পারলাম, তাদের রাগরাগ মনোভাবটা বন্ধুত্বে রূপ নিতে নিচ্ছে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, একে অন্যের পরিচয় জানার পর সব শেষে যে পরিচয়টা পাওয়া গেল তারা দুজনই বাল্যবন্ধু ছিলেন অথচ কেউ কাউকে চিনেনা। এ কথা শুনার পর কেবিনের সবাই একসাথে হাসা শুরু করল। না চেনারই কথা কারণ উভয়ই প্রবাসে থাকেন। বয়স হয়েছে, দাড়ি রেখেছেন, দাড়িও সফেদ হয়ে গেছে এবং অনেকদিন দেখাসাক্ষাৎ নাই তাই একে অন্যকে না চেনাটাই স্বাভাবিক। 

আরেকটা মজার বিষয় হল যিনি ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি ছিলেন এই লঞ্চের মালিক। 

যাইহোক, সবাই দারুণ হাসাহাসি করলাম। লঞ্চের মালিক নিজেই কেন্টিনে গিয়ে সবার জন্য চায়ের অর্ডার দিয়ে আসলেন। চা খেয়ে গপসপ করেতে করতে কিভাবে যে শেরপুর আসলাম টেরই পেলামনা। 

লঞ্চ যাত্রায় এমন বহু স্মৃতি আছে এরকম অনেক লিখা যাবে। পাগলা মজিদের কথা তো বললামইনা, ঐযে বাঁশের কঞ্চিড় দিয়ে বেহালা বাজিয়ে গান গাইত। কোন লঞ্চের ছবি দেখলে এই মজার ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। তখন মুচকি মুচকি হাসি।

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বাস থেকে অবিশ্বাস

তার অপেক্ষায়...

একতরফা প্রেম এবং অসমাপ্ত গল্প