তিউনিসিয়ায় এক সপ্তাহ
"বয়সের সাথে বুদ্ধি আসে,
ভ্রমণ এর সাথে অভিজ্ঞতা আসে"
"পুরো পৃথিবী একটি বই, এবং যারা ভ্রমণ করে না তারা কেবল এর একটি পৃষ্ঠা পড়ে"
উক্তিগুলো কোথায় যেন পড়েছিলাম টিক মনে নেই। আসলে প্রতিটি মানুষের ভ্রমণ করা দরকার যদি তার ইচ্ছা এবং সামর্থ্য থাকে। সত্যেন্দনাথ দত্তের কবিতায় পড়েছিলাম "জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি' দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী!"
আজকের জামানায় ফুল না কিনে ভ্রমণে যাইও হে সৌখিনদারী! হোক সে ভ্রমণ দেশে অথবা দেশের বাইরে নির্ভর করে সামর্থ্যের উপর। ফুল থেকে শুধু সুভাষ পাওয়া যায় আর ভ্রমণে অভিজ্ঞতা।
প্রতি বছর কোন না কোন দেশ ভ্রমণে যাওয়া হয় সেই ধারাবাহিকতায় এবারের সফর ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ায়। দেশটির আয়তন বাংলাদেশের চেয়ে কিছুটা বড় এবং জনসংখ্যা মাত্র ১কোটি ২০ লাখ। মাথাপিছু আয় আমাদের চেয়ে দ্বিগুণ। জনসংখ্যা কম হলে মাথাপিছু আয় বেশি হয় এটি স্বাভাবিক। আয়ের প্রধান উৎস অলিভ অয়েল, কার্পেট এবং ট্যুরিজম। দেশেটি ফ্রান্সের কলোনাইজ হওয়ায় বলা যায় রাজধানী তিউনিস শহর অনেকটা পেরিসের আদলের তৈরি। তাদের ভাষা আরবি হলেও ফ্রেঞ্চ তাদের সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ। মুদ্রা দিনার তবে ডলার পাউন্ডের চেয়ে ইউরোকে প্রাধান্য দেয় বেশি। তিউনিসিয়া একটি উন্নয়নশীল দেশ অবকাঠামো উন্নয়নে দেশকে যেভাবে সাজাচ্ছে আগামী ১০বছরে আরও বহুগুণ পর্যটক বাড়বে। ৯৯ ভাগ মুসলিম হলেও চলাফেরা অনেকটা ইউরোপ স্টাইলে। বার, ক্লাব, মদ-গাজা সবই আছে পর্যটন শহরগুলোতে। বেশিদিন হয়নাই রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম সরিয়ে সেকুলারিজমে মুভ করেছে। তাদের সোস্যালাইজ আমার পছন্দ হইছে দিনের বেলা গরমে কেউ বের হয়না সন্ধ্যা হলেই চায়ের দোকানে ফুটপাতে যার যার শিশা নিয়ে আড্ডা জমে। আমিও দুএকদিন আড্ডায় শামিল হয়েছিলাম কেননা আমি যে রিসোর্টে থাকতাম ঐ রিসোর্টের এক শেফের সাথে ভালই খাতির জমছিল।
টার্কিয়ে, মরক্কো, স্পেন এইসব দেশ ট্যুরিস্ট নির্ভরশীল দেশ। আমরা যতই ইউরোপ বা সিংগাপুরের সাথে তুলনা করে গলাবাজি করিনা কেন, আমাদের দেশ এখনো ঐসব দেশের তুলনায় তাদের হাটুর নিচে পড়ে আছে। বেশি দূর যাওয়ার দরকার নাই থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম বা মালদ্বীপ পর্যটকদের জন্য যেভাবে সাজিয়েছে আমারা তার সিকিভাগও আমরা করতে পারিনাই হুদাই লাফাই। তাদের রাস্তাঘাট, সার্ভিস স্টেশন, হোটেল রিসোর্টের সহজলভ্যতা, ট্যুরিস্টদের যে নিরাপত্তা সে তুলনায় আমাদের দেশটাকে ঐ জায়গায় নিতে পারিনি অথচ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিকে আমাদের দেশ কোন অংশে কম ছিলনা। দেশের পর্যটন এলাকাগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের করতে পারলে বিশাল একটা রেভিনিউ আসার সুযোগ হত।
সাধারণত; ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথে সার্ভিস স্টেশনে যে বিরতি দেয় জরুরি হাজতের জন্য, বিশ্বাস করেন মুতের গন্ধে আমার তো মুত আসেনা উল্টো বমি আসে। এদিকে সুইপার হাতে টিস্যু নিয়ে বসে থাকে বকশিসের আশায়। এমন পরিবেশে দেশে বিদেশি পর্যটক কি আশা করা যায়?
এগুলো এমন বড় কোন বিষয় না সরকার চাইলে সার্ভিস স্টেশনগুলো সওজ এর আওতায় নিতে পারে। বেতনভুক্ত সুইপার নিয়োগ দিয়ে পরিস্কার রাখতে পারতো। এই দেশে ঐসব জীবনেও আশা করা যাবেনা। সাত মণ ঘি-ও জুটবে না, রাধাও নাচবে না।
একটা শহরের সৌন্দর্য হচ্ছে শহরের চাকচিক্যময় বিল্ডিং, পরিস্কার রাস্তাঘাট এবং ফ্লাশি গাড়ি। বাইরের দেশে রস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে ব্রান্ডের গাড়ি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়, অথচ ঢাকা শহরের গাড়ির দিকে থাকালে মনে হয় জোড়াতালি দিয়ে বৃটিশ আমলের গাড়ি চলছে এই শহরে। নাম ডিজিটাল অথচ একটা গাড়ির নাম্বার প্লেট দিয়ে সার্চ দিলে গাড়ির কোন তত্ব পাওয়া যায়না।
পরিবারে একটা প্রাইভেট কার থাকবে এটি কার না শখ! কিন্তু চাইলেই অনেকে নিতে পারেনা গাড়ির যে আকাশচুম্বী দাম। ভাল মানের গাড়ি নিতে চাইলে আপনাকে শিল্পপতি, এমপি মন্ত্রী অথবা সরকারি আমলা হতে হবে। ইউরোপ আমেরিকা গাড়ি পানির মতো সস্তা যে মোটামুটি চলতে পারে তারও একটা ব্রান্ডের কার থাকে। দেশে গাড়ি নেয়ার সুযোগ থাকলে আমিও একটা নিতাম।
বাইরের দেশে হোটেল রিসোর্টে যে সুবিধা পাওয়া যায় আমাদের দেশে সে তুলনায় বলা যায় দিনদুপুরে ডাকাতি। উদাহরণ দিয়ে বলি আমি যে রিসোর্টে চিলাম ৭দিনে ফ্লাইট থাকা খাওয়া বিনোদন সব মিলিয়ে জনপ্রতি খরচ পরেছিল ৭০ হাজার টাকা। আমার দেশে ভাল মানের একটা রিসোর্টে শুধু থাকার খরচই আসে রাত প্রতি ১০ হাজারের উপরে বাকিগুলো তো বাদই দিলাম। এই দেশে পর্যটন ব্যাবসা আশা করা যায়?
চলবে....
Comments
Post a Comment